বসন্ত এসেগেছে : ফিরে দেখা দোলপূর্ণিমার বিভিন্ন মিথ - শুভজিৎ দে

আকাশে বহিছে প্রেম, নয়নে লাগিল নেশা
কারা যে ডাকিল পিছে! বসন্ত এসে গেছে..


ঠিক তা-ই। অনেকের কাছেই বসন্ত হলো প্রেমের ঋতু। প্রেমের বার্তা নিয়েই যেন আগমন ঘটে ঋতুরাজের। পশ্চিমা সংস্কৃতির দেখাদেখি আমাদের দেশেও ভ্যালেন্টাইনস ডে'র প্রচলন ঘটেছে বেশ কয়েক যুগ ধরেই, কিন্তু আকাশে-বাতাসে, হৃদয়ে-মননে প্রেমের আলোড়ন তুলতে আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যের বসন্ত বরণও কোনো অংশে কম নয়।

শীতের আবেশ কাটিয়ে প্রকৃতির নতুনরুপে জেগে উঠা। চারিদিকে গাছের নতুন পাতা, পলাশ-শিমুল গাছে রঙের খেলা, কোকিলের কুহু কুহু ডাকে মানবমনে লাগে দোলা। আর এসবই হলে বুঝতে হবে বসন্ত এসে গেছে। ঋতুরাজ বসন্তকে স্বাগত জানাতেই প্রকৃতি ও জীব এমনভাবে জানান দেয়।

ফাল্গুনের হাত ধরেই বসন্তের আগমন। পয়লা ফাল্গুন বা পহেলা ফাল্গুন বাংলা পঞ্জিকার একাদশতম মাস ফাল্গুনের প্রথম দিন ও বসন্তের প্রথম দিন। গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে ১৩ ফেব্রুয়ারি পহেলা ফাল্গুন বা বসন্ত উৎসব পালিত হয়।

কিন্তু মনে প্রশ্ন জাগতে পারে এই বসন্ত উৎসব কিভাবে এলো?

বসন্ত উৎসবকে দোলযাত্রাও বলা হয়। দোলযাত্রা মূলত একটি হিন্দু বৈষ্ণব উৎসব বলেই বিবেচিত। ইংরেজরা প্রথম দিকে এই উৎসবকে রোমান উৎসব ‘ল্যুপেরক্যালিয়া’ হিসেবেই মনে করেছিলো। অনেকে আবার একে গ্রীকদের উৎসব ‘ব্যাকানালিয়া’-এর সঙ্গেও তুলনা করতো।

বাৎসায়নের ‘কামসূত্র’ যা রচিত হয়েছিলো তৃতীয়-চতুর্থ শতকে, তাতে এই উৎসবের উল্লেখ আছে। ‘কামসূত্রে’ দোলায় বসে আমোদ-প্রমোদের কথা আমরা জানতে পারি।

সপ্তম শতকে রচিত শ্রীকৃষ্ণের ‘রত্নাবলী’ এবং অষ্টম শতকের ‘মালতী-মাধব’ নাটকেও এর বর্ণনা পাওয়া যায়। জীমূতবাহনের ‘কালবিবেক’ ও ষোড়শ শতকের ‘রঘুনন্দন’ গ্রন্থেও এই উৎসবের অস্তিত্ব রয়েছে।

মূলত পুরীতে দোলোৎসব ফাল্গুন মাসে প্রবর্তনের যে রেওয়াজ হয়, সেখান থেকেই বাংলায় চলে আসে এই সমারোহ। দোলযাত্রা বা হোলি উৎসব সংক্রান্ত পৌরাণিক উপাখ্যান ও লোককথাগুলো মূলত দুই প্রকার: প্রথমটি দোলযাত্রার পূর্বদিন পালিত বহ্ন্যুৎসব হোলিকাদহন বা মেড়াপোড়া সংক্রান্ত, এবং দ্বিতীয়টি রাধা ও কৃষ্ণের দোললীলা বা ফাগুখেলা কেন্দ্রিক কাহিনি।

দোল বা হোলি ধর্মীয় অনুষঙ্গের আড়ালে থাকা এক সামাজিক অনুষ্ঠানও বটে, যার সার্বজনীন আবেদন আছে। দোলযাত্রা উৎসবের একটি ধর্মনিরপেক্ষ দিকও রয়েছে। এখন আর শুধুমাত্র সনাতন ধর্মালম্বীদের মধ্যে হোলি খেলা নয়, বরং সব ধর্মের নারী পুরুষের মধ্যেই রঙ খেলার প্রবণতা দেখা যায়।

মধ্যযুগে সম্রাট আকবর বাংলা বর্ষপঞ্জী হিসেবে আকবরি সন বা ফসলী সনের প্রবর্তন করেন। সেসময় ১৪টি উৎসব পালনেরও রীতি প্রবর্তিত হয়। এর অন্যতম ছিলো বসন্ত উৎসব। সেসময় বাংলার সকল সম্প্রদায়ের মানুষই বসন্ত বরণে বিভিন্ন লোকজ উৎসব ও মেলায় অংশ নিতেন। পহেলা ফাল্গুনে বসন্ত উদযাপনের রীতিও ঐতিহ্যবাহী

বৃ্ন্দাবনে বরাবরই উদার পরিবেশ। গোঁড়ামির বাতাস তেমন স্থান পায়নি এখানে। কথিত আছে যে, এমন এক সময় সংকেত কুঞ্জে দেখা হয়েছে রাধা-কৃষ্ণের।  দিনটা ছিল বসন্তপঞ্চমীর।  আচমকাই শ্রীমতী খেয়াল করলেন উপর থেকে তাঁদের উপর কিছু ফুলের পাপড়ি ঝরে পড়ল।  ব্যাপার কী? কৃষ্ণ যোগবলে জানলেন, দেবতারা স্বর্গে রঙের উৎসব পালন করছেন। শ্রীমতীও বায়না ধরলেন রং খেলার জন্য। কৃষ্ণ জানালেন, সেদনিটা দেবতাদের জন্যই থাক, অন্য একদিন রংয়ে রেঙে ওঠা যাবে’খন। শ্রীমতীর সে আবদারই পূরণ হল ফাল্গুনি পূর্ণিমায়।  

আবার অনেকে বলেন ছোট্ট কৃ্ষ্ণ পুতনার বিষ-স্তন পান করার পর থেকেই কালোবরণ। এদিকে রাধা ও তাঁর সখীরা সকলেই গৌরবরণী।  তাই দেখে মা যশোদার কাছে অনুযোগ করলেন কৃষ্ণ।  মা তাঁকে জানালেন, কোনও একদিন গিয়ে কৃষ্ণও যেন গোপীদের রঙে রাঙিয়ে দেয়।  তাহলেই সব এক।  সেই থেকেই রংয়ের উৎসবের সূচনা।  কৃ্ষ্ণ আর তাঁর দলবল গিয়ে রাধাকে রঙ মাখিয়ে এসেছিলেন।  প্রত্যুত্তরে গোপীরা লাঠি হাতে তেড়ে এসেছিল।  আর আত্মরক্ষা করেছিল কৃ্ষ্ণের সখারা।  এই হল লাঠমার হোলি।

আবার অনেকে বলে থাকেন, কৃষ্ণ রাধাকে প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হন করেন, তার সারা শরীর জুড়ে ফুটে ওঠে কৃষ্ণের দেওয়া ভালোবাসর সব চিহ্ন, এমতাবস্থায় রাধা পুনরায় ঘরে ফিরবেন কি ভাবে! তখন শ্রী কৃষ্ণ তার যোগবলে সকলকে রাঙিয়ে তোলেন রঙে, সে রঙের ছোঁয়ায় রাধার শরীরে ফুটে ওঠা সমস্ত ভালোবাসার চিহ্ন আড়াল হয়ে যায় ও রাধাও সম্মানের সাথে তার ঘরে ফিরে যান । এভাবে বহু মিথ প্রচলিত রয়েছে দোলপূর্ণিমা নিয়ে।

Comments

  1. Replies
    1. ধন্যবাদ আপনাকে, শুভ দোলপূর্ণিমা।

      Delete

Post a Comment

If you have any doubt, please let me know.

Popular posts from this blog

সহজ পাঠ ও রবীন্দ্রনাথের অবনির্মান - শুভজিৎ দে

দেশীয় রাজ্যগুলির ভারত ভুক্তির উদ্যোগ ও বিতর্ক - শুভজিৎ দে

পতিতাবৃত্তির জন্ম ও বিবর্তন - শুভজিৎ দে